ব্লগ

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ লিখিত ও pdf download

তারপরে অনেক ইতিহাসহয়ে গেল, নির্বাচন হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানসাহেবের সঙ্গে দেখাকরেছি। আমি, শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাঁকে অনুরোধ করলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনিআমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টোসাহেবের কথা। তিনি বললেন, প্রথম সপ্তাহেমার্চ মাসে হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে, আমরা অ্যাসেম্বলিতেবসব। আমি বললাম, অ্যাসেম্বলির মধ্যে আলোচনাকরব; এমনকি আমি এ পর্যন্তবললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও যদি সে হয়, তার ন্যায্যকথা আমরা মেনে নেব।

জনাব ভুট্টো সাহেব এখানেএসেছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন যে আলোচনার দরজা বন্ধনা, আরও আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতৃবৃন্দেরসঙ্গে আলাপ করলাম, আপনারা আসুনবসুন, আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করি। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানেরমেম্বাররা যদি এখানে আসেন, তাহলে কসাইখানাহবে অ্যাসেম্বলি। তিনি বললেন, যে যাবে তাকেমেরে ফেলে দেওয়া হবে। যদি কেউঅ্যাসেম্বলিতে আসে তাহলে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত দোকানজোর করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম, অ্যাসেম্বলি চলবে। তারপর হঠাৎ ১ তারিখে অ্যাসেম্বলিবন্ধ করে দেওয়া হলো।

ইয়াহিয়া খান সাহেব প্রেসিডেন্ট হিসাবে অ্যাসেম্বলিডেকেছিলেন। আমি বললামযে, আমি যাব। ভুট্টো সাহেববললেন, তিনি যাবেন না। ৩৫ জন সদস্যপশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানেআসলেন। তারপরে হঠাৎ বন্ধকরে দেওয়া হলো। দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষদেওয়া হলো আমাকে। বন্দুকের মুখেমানুষ প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠল।

আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা হরতালপালন করেন। আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সবকিছু বন্ধ করে দেন। জনগণসাড়া দিল। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায়বেরিয়ে পড়ল। তারা শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রামচালিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো।

মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ্।

কী পেলাম আমরা? যে আমারপয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকেদেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছেআমার দেশের গরিব-দুঃখী আর্তমানুষের বিরুদ্ধে, তার বুকের উপরহচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু।

আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায়যাবার চেষ্টা করেছি, তখনই তারা আমাদেরউপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। টেলিফোনে আমার সঙ্গে তাঁরকথা হয়। তাঁকে আমি বলেছিলাম, জনাব ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানেরপ্রেসিডেন্ট, দেখে যান কীভাবে আমারগরিবের উপরে, আমার বাংলার মানুষেরউপরে গুলি করা হয়েছে, কী করে আমার মায়ের কোল খালিকরা হয়েছে। আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন। তিনি বললেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ১০ তারিখে রাউন্ডটেবিল কনফারেন্স ডাকব।

আমি বলেছি, কিসের বৈঠক বসবে, কার সঙ্গেবসব? যারা আমার মানুষের বুকের রক্তনিয়েছে, তাদের সঙ্গে বসব? হঠাৎ আমারসঙ্গে পরামর্শ না করে পাঁচ ঘণ্টাগোপনে বৈঠক করে যে বক্তৃতাতিনি করেছেন, সমস্ত দোষ তিনি আমারউপরে দিয়েছেন, বাংলার মানুষেরউপর দিয়েছেন।

ভাইয়েরা আমার, ২৫ তারিখেঅ্যাসেম্বলি কল করেছে। রক্তের দাগশুকায় নাই। আমি ১০ তারিখে বলে দিয়েছিযে ওই শহীদের রক্তের উপর পা দিয়ে কিছুতেইমুজিবুর রহমান যোগদান করতেপারে না। অ্যাসেম্বলি কল করেছে। আমার দাবিমানতে হবে: প্রথম, সামরিক আইন মার্শাল ল উইথ ড্র করতে হবে, সমস্ত সামরিকবাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে, যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে, আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে । তারপর বিবেচনাকরে দেখব, আমরা অ্যাসেম্বলিতে বসতে পারব কিপারব না। এর পূর্বে অ্যাসেম্বলিতে বসতেআমরা পারি না।

আমি, আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষেরঅধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবারচাই যে আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালেরজন্য বন্ধ থাকবে। গরিবের যাতেকষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষকষ্ট না করে, সে জন্য সমস্ত অন্যান্যজিনিসগুলো আছে, সেগুলির হরতাল কালথেকে চলবে না। রিকশা, গরুর গাড়িচলবে, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে; শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি গভর্নমেণ্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদাকোনো কিছু চলবে না।

২৮ তারিখে কর্মচারীরাবেতন নিয়ে আসবেন। এর পরে যদিবেতন দেওয়া না হয়, আর যদি একটাগুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমারঅনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়েতোল। তোমাদের যা কিছুআছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতেহবে, এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করেদেবে। আমরা ভাতে মারব, আমরাপানিতে মারব। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদেরকিছু বলবে না। কিন্তু আর আমারবুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টাকরো না। সাত কোটি মানুষকেদাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখনমরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দমাতেপারবে না।

আর যে সমস্ত লোকশহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগের থেকেযদ্দুর পারি তাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করব। যারাপারেন আমার রিলিফ কমিটিতেসামান্য টাকাপয়সা পৌঁছিয়ে দেবেন। আর এই সাত দিন হরতালে যে সমস্তশ্রমিক ভাইরা যোগদান করেছেন, প্রত্যেকটাশিল্পের মালিক তাঁদের বেতনপৌঁছায়ে দেবেন। সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমিযা বলি তা মানতে হবে। যেপর্যন্ত আমার এই দেশেরমুক্তি না হবে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়াহলো, কেউ দেবে না। মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদেরমধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটপাট করবে।

এই বাংলায় হিন্দু মুসলমানবাঙালি অবাঙালি যারাআছে, তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে। আমাদের যেনবদনাম না হয়। মনে রাখবেন রেডিওটেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতেআমাদের কথা না শোনেন, তাহলে কোনোবাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেননা। যদি টেলিভিশন আমাদেরনিউজ না দেয়, কোনো বাঙালি টেলিভিশনেযাবেন না। দুই ঘণ্টা ব্যাংকখোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মায়নাপত্রনিবার পারে। কিন্তু পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানেএক পয়সাও চালান হতেপারবে না। টেলিফোন টেলিগ্রাম আমাদেরএই পূর্ব বাংলায় চলবে এবং বিদেশেরসঙ্গে নিউজ পাঠাতে চালাবেন।

কিন্তু যদি এ দেশের মানুষকেখতম করার চেষ্টা করাহয়, বাঙালিরা বুঝে–শুনে কাজকরবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগেরনেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়েতোল এবং তোমাদের যা কিছু আছেতাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।

৭ই মার্চের ভাষণ লিখিত pdf download

আপনি ইতিমধ্যে টেক্সট আকারে দেখে নিয়েছেন বঙ্গবন্ধ শেখ মজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষণটি। যদি আপনার ৭ই মার্চের এই ভাষণ লিখিত file pdf download আকারে প্রয়োজন হয় তবে নিচের বাটনে প্রেস করুন।

ডাউনলোড করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button